মুক্ত হোক প্রিয় জামিয়া!

লিখেছেন:
জামিয়া ইসলামিয়া কলাকোপা’র
প্রাক্তণ ছাত্র
মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ

কৈশোর আর তারুণ্যের অনন্ত বাগানে তুমি ছিলে আমার ছায়াবৃক্ষ।
তোমার দেয়ালে দেয়ালে, খিলানে খিলানে লেগে আছে আমার নিঃশ্বাসের গন্ধ,
তোমার প্রতিটি ইট যেন আমার হৃদয়ের রক্তে ভেজা।
তুমি ছুঁয়ে দিতে আমায়, আমিও তোমার প্রতিটি ধুলিকণাকে প্রাণভরে ভালোবেসে ছুঁয়ে দিতাম।
তুমি ছিলে দীপ্ত, গর্বিত, মহিমান্বিত—
তুমি ছিলে আমার স্বপ্নের প্রাঙ্গণ, জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়ের ধ্যানভূমি।

তোমার অতীত নিয়ে আমরা শুনেছি শত শত গল্প,
বৃদ্ধদের কণ্ঠে জেগে উঠতো ইতিহাসের অমল স্মৃতি।
সেই গল্পের মাঝেই জন্ম নিতো তোমার প্রতি এক নির্ভেজাল ভালোবাসা—
যে ভালোবাসা শুধু চোখে নয়, হৃদয়ের গভীরে গাঁথা ছিল।
তোমার ছেয়ে যাইনি কখনো,
তোমার আঁচল জড়িয়ে রেখেছিলাম শক্ত হাতে,
যেন তোমার ব্যথা আমার হোক, তোমার জয়ে উঠুক আমার কণ্ঠস্বরে আনন্দের রোল।

বছরের প্রতিটি ঋতুতে, প্রতিটি ক্লান্ত দুপুরে, কাঁপা রাতের গভীরে—
তোমার শক্তি ও সম্মানের জন্য বিসর্জন দিয়েছি কৈশোরের হাসি,
তারুণ্যের স্বপ্ন, জীবনের মাধুর্য।
কখনো কাঠফাটা চৈত্রে, পা ফেটে রক্তারক্তি করে হেঁটেছি মাইলের পর মাইল—
চাঁদার বস্তা মাথায় তুলে।
কখনো হাড়কাঁপানো শীতে ঘুরেছি বাজারে বাজারে,
মাহফিলের নামে টাকা তুলতে গিয়ে ঝরেছে ঘাম, কখনো কেঁপেছে বুক।
ঈদের আনন্দ বিলিয়ে দিয়েছি মানুষে মানুষে—
কোরবানির দিন রক্তমাখা জামা গায়ে, পাঁচটা চামড়া নিয়ে খাঁদে পড়ে
বুকের যে যন্ত্রণা পেয়েছিলাম,
সেই যন্ত্রণা আজো আমার শরীরের গভীরে ধুকধুক করে বাজে!

প্রিয় জামিয়া!
তুমি একদিন ছিলে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের নাম।
তোমার দরজায় কড়া নাড়েনি অনেকে—
কারণ তুমি ছিলে অনাদৃত, অবহেলিত, কণ্টকাকীর্ণ।
তোমাকে ঘৃণা করে দূরে ঠেলে দিয়েছে যারা,
তারা আজ তোমার দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে মুখে দয়ামায়ার মুখোশ পরে।
আজ তারা তোমার ছাত্র, তোমার কর্ণধার—
তাদের মায়ার আড়ালে লুকিয়ে আছে নিঃসঙ্গ হায়নার থাবা!
তোমার সন্তানদের ঠেলে দিয়েছে প্রান্তে,
আর নিজেদের গোলামদের বানিয়েছে অভিভাবক!

তোমার সাহসী সন্তানরা যুগে যুগে হেনস্তা হয়েছে—
রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের জালে আটকে,
তোমাকে রক্ষা করতে গিয়ে চোখের জলে ভিজিয়েছে নামাজের জায়নামাজ।
তারা জানতো—তোমাকে হায়নারা টুকরো টুকরো করে ফেলতে চায়।
তবুও তারা হার মানেনি, ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে থেকেছে বুক টান করে।
শেষ পর্যন্ত চলে যেতে বাধ্য হয়েছে—
আকাশের দিকে চেয়ে, গ্রীষ্মের ঝাঁজালো হাওয়া বুকের ভেতর টেনে নিয়ে,
আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

প্রিয় জামিয়া!
তুমি কেন বারবার রাক্ষসদের হাতবদল হও?
তুমি কেন নিজেই মুক্তির স্বপ্ন দেখতে ভয় পাও?
তোমার শরীরে নখর আঁচড়ের যন্ত্রণা,
তোমার আত্মা ক্ষতবিক্ষত—
তবুও কেন তুমি চুপ করে থাকো?
তুমি কী জানো না, তুমি তোমার সন্তানদের কাছে কতটা মহামূল্যবান?
তারা আজো চায়—তুমি উঁচু হয়ে দাঁড়াও, ফিরো আত্মমর্যাদার স্বর্ণযুগে।

আজকের সকাল,
আকাশে রোদের উজ্জ্বল আলো ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে—
আমি তোমার মুক্তির জন্য দু’হাত তুলে ফরিয়াদ করছি রবের দরবারে:

“হে আমার প্রিয় জামিয়া!
মুক্ত হও—শিকল ভেঙে ফেলো।
স্বাধীন হও—কোনো কৃত্রিমতার কাছে মাথা নত করো না।
শির উঁচু করে দাঁড়াও—তোমার সন্তানদের হাতে নিরাপদ থাকো।
আত্মমর্যাদার দীপ্তিতে জ্বলে ওঠো পুনরায়।”